দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের ওপর নজরদারি ব্যবস্থা কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। রাস্তাঘাট, দোকান, ভবন ও গণপরিবহনে থাকা ক্যামেরার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের চলাচল ও অবস্থান সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে সার্ভেইল্যান্স টেকনোলজি ওভারসাইট প্রজেক্টের নির্বাহী পরিচালক মিশেল ডালের সঙ্গে দেখা করতে যান বিবিসির এক প্রতিবেদক। কাউকে না জানিয়েই সেখানে যাওয়ার পরও ডালের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই নজরদারি ব্যবস্থা তাদের একসঙ্গে থাকার বিষয়টি শনাক্ত করতে পারে বলে ডাল জানান।
একটি সড়কবাতির খুঁটির দিকে ইঙ্গিত করে ডাল বলেন, সেখানে কালো প্লাস্টিকের আবরণের ভেতরে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের দুটি ছোট ক্যামেরা রয়েছে। এগুলো নিউইয়র্ক পুলিশের ‘ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস সিস্টেম’ নামের বিশাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার অংশ।
ডালের দাবি, শহরের প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তা নিজের ফোনে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রায় যেকোনো পথচারীর একটি তথ্যচিত্র দেখতে পারেন। তার মতে, এই ব্যবস্থার সঙ্গে ৮০ হাজারের বেশি ক্যামেরা, উড়োজাহাজবিহীন যান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য এবং এমন কিছু ব্যবস্থা যুক্ত রয়েছে, যেগুলো গাড়ির গতিবিধি অনুসরণ করতে পারে, এমনকি গাড়ি অন্য অঙ্গরাজ্যে গেলেও।
এর ফলে একজন ব্যক্তি গত এক সপ্তাহে কার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং কোথায় কোথায় গেছেন, সে সম্পর্কেও তথ্য জানা সম্ভব হতে পারে বলে জানান ডাল।
নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লক সেফটি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলেও এটি এই বিশাল শিল্পের কেবল একটি অংশ। ফ্লক ও এর সমর্থকেরা বলছেন, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে একটি সমঝোতা প্রয়োজন।
নিউইয়র্কে ফ্লক সেফটি কাজ না করলেও সেখানে নজরদারি ব্যবস্থা যে ব্যাপক, তা বিবিসির প্রতিবেদকের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে। ডালের সঙ্গে ম্যানহাটনে বিবিসির কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার সময় তিনি বিভিন্ন ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্র দেখান। কয়েক পা হাঁটার পরই প্রতিবেদক ১৬টি আলাদা ক্যামেরা দেখতে পান।
ডালের ধারণা, এসব ক্যামেরার অনেকগুলো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ভবন ও বাসাবাড়ির মালিকদের। এগুলো শহরের নিজস্ব ক্যামেরার অতিরিক্ত। তবে কোনো তদন্তের প্রয়োজন হলে নিউইয়র্ক পুলিশ সহজেই এসব ক্যামেরার ধারণ করা ভিডিও পেতে পারে বলে জানান তিনি। কিছু ক্যামেরা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাও রয়েছে, যার মাধ্যমে পুলিশ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সরাসরি ভিডিও চেয়ে পেতে পারে।
হাঁটার সময় দোকানের সামনে ছোট আকারের ক্যামেরা, ভবনের কোণে পুরোনো ক্যামেরা এবং শহরের উন্নত দ্বৈত ক্যামেরা চোখে পড়ে। এসব ক্যামেরা ঘোরানো, ওপর-নিচ করা এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নজর কেন্দ্রীভূত করার সক্ষমতা রাখে। এত বেশি ক্যামেরা ছিল যে সেগুলো গুনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ডালের ভাষায়, ‘যত বেশি খুঁজবেন, তত বেশি দেখতে পাবেন।’
নজরদারি নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে ফ্লক সেফটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ছয় হাজার সম্প্রদায়ে তাদের এক লাখের বেশি ক্যামেরা রয়েছে। গাড়ির গতিবিধি অনুসরণকারী প্রযুক্তির জন্য প্রতিষ্ঠানটি বেশি পরিচিত। ফ্লকের তথ্য অনুযায়ী, তাদের ব্যবস্থা প্রতি মাসে দুই হাজার কোটি বার গাড়ি স্ক্যান করে। পাশাপাশি মানুষের মুখ ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার প্রযুক্তিও রয়েছে তাদের।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো নিজেদের এলাকার বাইরেও নজরদারি করতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেক্সাসের এক শেরিফ গর্ভপাত-সংক্রান্ত একটি মামলায় এক নারীকে খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ফ্লকের ৮৩ হাজারের বেশি ক্যামেরায় প্রবেশাধিকার নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে এমন অঙ্গরাজ্যও ছিল, যেখানে গর্ভপাত বৈধ।
ফ্লক সেফটির দাবি, তাদের প্রযুক্তি নিরাপত্তা বাড়ায় এবং এমন অপরাধ সমাধানে সহায়তা করে, যেগুলো অন্যথায় অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। তবে অন্তত ৪৬টি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তারা অনুমোদনহীন কাজে ফ্লকের ব্যবস্থা ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সঙ্গী, সাবেক সঙ্গী ও অপরিচিত ব্যক্তিকে অনুসরণ করার ঘটনাও ছিল। পরে অপব্যবহার ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে।
ফ্লক সেফটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হয়েছে। কোথাও কোথাও মানুষ ক্যামেরা নষ্ট করেছেন, এমনকি ক্যামেরার ওপর প্রস্রাবও করেছেন। চলতি বছর ৫০টির বেশি শহর ফ্লকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্রের দাবি, ফ্লক ছেড়ে যাওয়া সম্প্রদায়ের তুলনায় নতুন গ্রাহক যুক্ত হচ্ছে প্রায় ১০ গুণ হারে।
ফ্লকের দাবি, তাদের প্রযুক্তি নিখোঁজ শিশু খুঁজে বের করা, হত্যা ও সহিংস অপরাধের তদন্ত এবং চুরি যাওয়া গাড়ি উদ্ধারে সহায়তা করে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে আরও স্পষ্ট আইন ও বিধিমালার পক্ষে কাজ করছে বলে জানিয়েছে।
নিউইয়র্ক পুলিশও তাদের নজরদারি ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। পুলিশের একজন মুখপাত্র বলেন, এসব ব্যবস্থা শহরকে নিরাপদ রাখতে সহায়তা করে এবং বিভাগটি তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে স্বচ্ছতার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আইন মেনে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়েও তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান তিনি।
তবে ফ্লকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অপরাধ সমাধানের দাবির পেছনে ব্যবহৃত তথ্য ও পদ্ধতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন রয়েছে। ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের সহযোগী পরিচালক রিন্ডালা আলাজাজি বলেন, নিরাপত্তার অজুহাতে নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহারকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তার মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি বরং বিশ্বকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
নিজের এলাকায় কোথায় নজরদারি ক্যামেরা রয়েছে, তা জানার জন্য কয়েকটি মানচিত্রভিত্তিক ব্যবস্থাও রয়েছে। ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের ‘অ্যাটলাস অব সার্ভেইল্যান্স’-এ শহর, অঙ্গরাজ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা বা নজরদারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অনুযায়ী তথ্য খোঁজা যায়। তবে এর তথ্য সম্পূর্ণ নয়।
আরেকটি ব্যবস্থা ‘ডিফ্লক’ হলো সাধারণ মানুষের তৈরি একটি মানচিত্র, যেখানে ফ্লকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার ক্যামেরার অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। যে কেউ এতে তথ্য সম্পাদনা করতে পারেন বলে এর নির্ভরযোগ্যতা কিছুটা কম হতে পারে। তারপরও বিবিসির প্রতিবেদকের বাড়ি থেকে হাঁটার দূরত্বে চারটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ক্যামেরার অবস্থান এই মানচিত্রে শনাক্ত করা হয়েছে।
নজরদারি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বিষয় নয়। যুক্তরাজ্যেও মুখ শনাক্তকারী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। পুলিশ এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে হাজার হাজার গ্রেপ্তারের কথা বললেও সমালোচকেরা এটিকে নজরদারি ব্যবস্থার উদ্বেগজনক বিস্তার হিসেবে দেখছেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানেও ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ছে।
ডালের পরামর্শ, মানুষকে নিজের আশপাশে কোথায় নজরদারি করা হচ্ছে এবং সংগৃহীত তথ্য কোথায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত। তার মতে, মানুষ যত বেশি বিষয়টি সম্পর্কে জানবে, তত বেশি আইন পরিবর্তনের দাবিতে চাপ তৈরির উদ্যোগে অংশ নিতে পারবে।
কিছু এলাকায় ফ্লকের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পেছনেও স্থানীয় বাসিন্দাদের চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমনকি কোনো কোনো শহরে বাসিন্দারা সিটি কাউন্সিলের বৈঠকে ডার্থ ভেডারের পোশাক পরে প্রতিবাদ করেছেন।
বিবিসির প্রতিবেদক ও ডাল প্রায় এক ঘণ্টা একসঙ্গে থাকার সময় খুব কম মুহূর্তই ছিল যখন তারা কোনো ক্যামেরার নজরদারির বাইরে ছিলেন। ম্যানহাটনে হাঁটার পর তারা পাতালরেলে ওঠেন। যাতায়াতের প্রতিটি ধাপে ক্যামেরা তাদের গতিবিধি ধারণ করে। স্টেশন থেকে বের হওয়ার পরও অপেক্ষা করছিল আরও ক্যামেরা।
শেষ পর্যন্ত বিবিসির কার্যালয়ে ঢুকে প্রতিবেদক লিফটের বোতাম চাপেন। দরজা খোলার পর তার সামনেই দেখা যায় একটি কালো ক্যামেরা। অর্থাৎ, আশপাশে তাকালে বোঝা যায়—প্রায় সর্বত্রই কেউ না কেউ নজর রাখছে।
/অ